গুরু বর্জনের কারণ ও গুরু গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা

Manoban Kolimullah Haque

বিষয়: আধ্যাত্মিকবিদ্যা, আত্মদর্শন, আত্মতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, দিব্যজ্ঞান, পরম্পরাতত্ত্ব ও নরত্বারোপ

ভূমিকা

মানুষ কেন গুরু গ্রহণ করে? গুরু গ্রহণের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? আত্মদর্শন ও আত্মতত্ত্ব অর্জনের জন্য কি সত্যিই একজন গুরুর প্রয়োজন আছে?

বর্তমান সমাজে অনেকেই সামাজিক রীতি হিসেবে গুরু গ্রহণ করেন। কেউ আশ্রমে নাম লেখান, কেউ বার্ষিক দর্শনী দেন, আবার কেউ শুধুমাত্র পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু গুরু গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য যদি আত্মজ্ঞান, আত্মশুদ্ধি ও দিব্যজ্ঞান অর্জন না হয়, তাহলে সেই গুরু গ্রহণ অর্থহীন হয়ে যায়।

গুরু বর্জনের কারণ ও গুরু গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা
গুরু বর্জনের কারণ ও গুরু গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা 


গুরু গ্রহণের প্রকৃত উদ্দেশ্য

গুরু গ্রহণের প্রধান উদ্দেশ্য হলো—

  • আত্মদর্শন অর্জন
  • আত্মতত্ত্ব জানা
  • দেহতত্ত্ব অনুধাবন করা
  • আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করা
  • পরম্পরার প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করা
  • নরত্বারোপের মাধ্যমে মানবিক উৎকর্ষ অর্জন করা

গুরু গ্রহণের মাধ্যমে একজন শিষ্য কেবল ধর্মীয় আচারের শিক্ষা গ্রহণ করেন না; বরং নিজের অস্তিত্ব, জীবন, কর্ম ও চেতনার গভীর উপলব্ধি লাভের পথে অগ্রসর হন।

গুরুদীক্ষা কী?

গুরুদীক্ষা এমন একটি শিক্ষা যা মানুষের অজ্ঞানতা দূর করে এবং দিব্যজ্ঞান প্রকাশ করে।

প্রকৃত দীক্ষা শুধুমাত্র কোনো মন্ত্র পাঠ বা শব্দ শ্রবণ নয়। বরং এটি হলো সঠিক জীবনপদ্ধতি, আত্মসংযম, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনের কৌশল গ্রহণ করা।

দীক্ষার মাধ্যমে মানুষ শিখে—

  • আত্মনিয়ন্ত্রণ
  • সত্যনিষ্ঠা
  • সংযম
  • আত্মশুদ্ধি
  • নৈতিক জীবনযাপন

গুরুপাঠ কী?

অনেকেই মনে করেন গুরুপাঠ মানেই কোনো রহস্যময় মন্ত্র। বাস্তবে গুরুপাঠ হলো জীবনচর্চার শিক্ষা।

গুরুপাঠের অন্তর্ভুক্ত—

  • শ্বাস-প্রশ্বাসের সচেতনতা
  • আত্মসংযম
  • অল্প আহার
  • অল্প কথা বলা
  • চরিত্র গঠন
  • নৈতিকতা ও আত্মশুদ্ধি

অর্থাৎ গুরুপাঠ হলো আত্মউন্নয়নের একটি বাস্তব জীবনপদ্ধতি।

প্রকৃত গুরু কাকে বলে?

আধ্যাত্মিক দর্শনে রক্তমাংসের মানুষকে প্রকৃত গুরু বলা হয় না; প্রকৃত গুরু হলো জ্ঞান।

যতক্ষণ কোনো ব্যক্তির জ্ঞান সত্য, আত্মদর্শন ও নৈতিকতার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, ততক্ষণ তিনি গুরুর মর্যাদা লাভ করেন। কিন্তু যখন তিনি সত্য থেকে বিচ্যুত হন, তখন তাঁর গুরুত্বও নষ্ট হয়ে যায়।

গুরু কত প্রকার?

আধ্যাত্মিক দর্শনে গুরু চার প্রকার—

  1. মানুষগুরু
  2. জগৎগুরু
  3. কামগুরু
  4. পরমগুরু

এর মধ্যে মানুষগুরু পরিবর্তনশীল। তাই অন্ধ অনুসরণ নয়, বরং জ্ঞান ও সত্যের ভিত্তিতে গুরুকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

কখন গুরু বর্জন করা প্রয়োজন?

যেমন গুরু গ্রহণ প্রয়োজনীয়, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে গুরু বর্জনও প্রয়োজনীয়।

নিম্নোক্ত অবস্থায় কোনো গুরুকে অনুসরণ করা উচিত নয়—

১. মিথ্যাচার

যদি কোনো গুরু প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন এবং নিয়মিত মিথ্যা বলতে অভ্যস্ত হন।

২. অর্থ আত্মসাৎ

যদি তিনি অর্থনৈতিক দুর্নীতিতে জড়িত হন এবং তা প্রমাণিত হয়।

৩. অনৈতিক কর্মকাণ্ড

নারীঘটিত বা অন্য কোনো অনৈতিক কাজে জড়িত হলে।

৪. অপরাধমূলক কার্যকলাপ

চুরি, দস্যুতা, অপহরণ, সহিংসতা বা হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত হলে।

৫. মাদকাসক্তি

মাদকাসক্ত গুরু আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের যোগ্যতা হারান।

৬. বিচারালয়ে দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়া

গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে।

৭. অর্থ ও কামলিপ্সা

অতিরিক্ত অর্থলোভ ও কামলোভ আধ্যাত্মিক নেতৃত্বকে ধ্বংস করে।

প্রকৃত গুরুর দায়িত্ব

একজন প্রকৃত গুরুর দায়িত্ব হলো—

  • শিষ্যদের আত্মদর্শন শিক্ষা দেওয়া
  • জটিল পরিভাষার সহজ ব্যাখ্যা করা
  • সত্য ও যুক্তিনির্ভর শিক্ষা প্রদান করা
  • বিভিন্ন মতবাদ সম্পর্কে তুলনামূলক ধারণা দেওয়া
  • মনগড়া কাহিনি প্রচার না করা
  • প্রমাণভিত্তিক জ্ঞান উপস্থাপন করা

উপসংহার

গুরু গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য কখনোই অন্ধ আনুগত্য নয়। প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো আত্মদর্শন, আত্মতত্ত্ব, আত্মশুদ্ধি এবং দিব্যজ্ঞান অর্জন করা।

যে গুরু মানুষকে সত্য, জ্ঞান ও আত্মউপলব্ধির পথে পরিচালিত করেন, তিনিই প্রকৃত গুরু। আর যে গুরু সত্য থেকে বিচ্যুত হন, তাঁকে অনুসরণ না করাই শ্রেয়।

মহাত্মা লালন সাঁইজির ভাষায়—

“আগে সন্ধি বুঝো, পরে প্রেমে মজো।”

অতএব, গুরু গ্রহণের আগে গুরুবাদ, আত্মদর্শন ও পরম্পরার প্রকৃত অর্থ জানা অপরিহার্য।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন