জন্মের আগে চারপতি ও চল্লিশপতি গোপনে

বলন দর্শনের দেহতাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক রূপক ব্যাখ্যা

ভূমিকা

বাংলা আধ্যাত্মিক সাহিত্য, মরমি দর্শন এবং দেহতত্ত্বভিত্তিক গীতিকাব্যে প্রতীকী ভাষার ব্যবহার একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য। বহু শব্দ, চরিত্র ও ঘটনা আক্ষরিক অর্থে নয়; বরং মানবদেহ, চেতনা, সৃষ্টি ও আত্ম-উপলব্ধির রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

জন্মের আগে চারপতি ও চল্লিশপতি গোপনে
মহাধীমান বলন কাঁইজি


মহাধীমান বলন কাঁইজি তাঁর বলন তত্ত্বাবলী-তে এই ধারাকে নতুন ব্যাখ্যার মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। সেখানে "জন্মের আগে চারপতি চল্লিশপতি গোপনে" একটি গুরুত্বপূর্ণ দেহতাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক রূপক, যা মানবজন্ম, সৃষ্টি ও আত্মচেতনার প্রতীকী বিশ্লেষণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।


রাগিণী/ (Tune) ‘لحن’ (লুহানা)-
তাল/ (Rhythm)/ ‘إيقاع’ (ইক্বাউ)-
-------------------------------------------------------------
“(গুরু গো... গুরু আমার.. ও)
জন্মের আগে চারপতি 
 চল্লিশপতি গোপনে 
কী বিয়া করাইল দাদা 
 ভাতারখাকীর সনে।

সবে কয় কন্যা সতী
মাসে ধরে নতুনপতি
তাইতো; জীবের এ দুর্গতি 
 দেখি বিশ্বভুবনে (গুরু গো)। 

কেমনে তারে বারণ করি
সঙ্গে তাহার রয় শ্বাশুড়ী
ষষ্ঠসখীর জ্বালায় পুড়ি 
 সুখ পেলাম না জীবনে (গুরু গো)। 

ও সে দেবপুরী কুলবালা
গলায় পতির মুণ্ডমালা
শতধামে রঙ্গলীলা
 বলন কয় নিশিদিনে (গুরু গো)।”
 
#সারমর্ম (Essence)/ ‘جوهر’ (জুহার)
আলোচ্য সুমহান বলনটি বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক, সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক অঙ্গন উত্তরণের বিখ্যাত রূপকার ও বাঙালি মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিশ্ববিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে গ্রহণ করা হয়েছে। এখানে; কবি কল্পিত এক হতভাগার করুণ বিবরণ উপস্থাপন করেছেন।
 
কাঁইজির কল্পিত হতভাগা হলেন স্বর্গীয় কিন্নর ‘বিম্বল’ এবং কল্পিত ভাতারখাকী হলেন স্বর্গীয়াকিন্নরী ‘রতী’। 

এখানে; বিম্বল জ্ঞানগুরুর নিকট উপস্থাপিত বিষয়াদি জানতে চেয়েছেন। বিয়ের পূর্বেই যে কিন্নরীর আরও ৪০টি স্বামী ছিল তা কিন্নর জানতেন না।

 তারপর; কিন্নর বলেছেন; দাদা লোকজন তো কিন্নরীকে সতী বলেন কিন্তু সে কী করে সতী হতে পারেন? কারণ তিনি প্রতি মাসেই নতুন নতুন বিয়ে বসেন।

 বিষয়টি সঠিকভাবে না জানা ও না বুঝার কারণেই জগতের মানুষের এত দুর্গতি ও এত অশান্তি। বিম্বলের করুণ আর্তনাদ হলো; এত পতি গ্রহণ করার বিষয়টি তাঁর শ্বাশুড়ীর দাম্ভিকতা ও দৌরাত্যের কারণে তাঁকে নিষেধ করাও অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। 

তাঁর সাথে সর্বদা ছয়জন সখী থাকে। তাঁরাও সর্বদা অনেক জ্বালাতন করে থাকেন। কিন্নরের করুণ আকুতি হলো এমন ভয়ঙ্কর চরিত্রের স্বর্গীয়া কিন্নরীকে বিয়ে করে তিনি জীবনে কখনই সামান্যতম সুখও পান নি। 

পরিশেষে কিন্নর বলেছেন; তিনি কোনমতেই এদেশের বা এ পৃথিবীর মেয়ে নন বরং তিনি স্বয়ং স্বর্গধামের মেয়ে। সর্বদা তাঁর গলায় শত পতির মুণ্ডমাল্য শোভিত থাকে।

 তিনি এতই দাম্ভিকিনী যে; তিনি সর্বদা সারাবিশ্বের সর্ব নরধামে রঙ্গলীলা করে বেড়ান এবং লীলার ক্ষেত্রে তার নিকট রাতদিন সর্বদা সমান।    

বাঙালি পৌরাণিক রূপক পরিভাষা 
(Bangali mythological metaphorical terminology)
কন্যা, কুল, কুলবালা, জন্ম, দেব, দেবপুরী, পতি, বারণ, বিশ্ব, বিশ্বভুবন, ভাতার, ভাতারখাকী, মুণ্ড, মুণ্ডমালা, রঙ্গ, রঙ্গলীলা, শতধাম, শ্বাশুড়ী, সতী, সুখ। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘বাঙালি পৌরাণিক রূপক পরিভাষা’র অভিধা অনুচ্ছেদ দেখুন।

প্রশ্ন ও উত্তর (Questions & Answers)/
‘اسئلة واجابات’ (আসইলা ওয়া ইজাবাত)
১ জন্মের আগে চারপতি কী? 
(What is the four-husband before the birth?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
শ্বরবিজ্ঞানে ভূমিষ্ঠকে জন্ম, রতীকে কন্যা এবং আদি-চতুর্ভূতকে চারপতি বলা হয়। আদি-ভূত পাঁচটি। যথা; ১.আগুন ২.জল ৩.মাটি ৪.বাতাস ও ৫.বিদ্যুৎ। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্বে জরায়ুতে কেবল ১.আগুন, ২.জল, ৩.মাটি ও ৪.অলোক; এ চতুর্ভূত অবস্থান করে। 

তাই; স্থূলদৃষ্টি অনুযায়ী বলা হয় গর্ভাবস্থায় সন্তানের নিকট বাতাস সদৃশ আদি-ভূতটি থাকে না। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সন্তানের নাসিকা দ্বারা বাতাস প্রবেশ করে এবং সন্তান কেঁদে ওঠে। পুরো এ প্রজনন প্রক্রিয়াটি কেবল শুক্র সদৃশ অনুঘটকের দ্বারা সংঘটিত হয়। জন্মের আগে দেহে কেবল চতুর্ভূত থাকে। তাই; রতী সদৃশ কন্যার জন্মের আগে আদি-চতুর্ভূত সদৃশ চারপতির কথা বলা হয়। 

২ গোপন চল্লিশ-পতি কী? (What is the secret forty-spouse?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
শ্বরবিজ্ঞানে দেহের ৪০ ‘পৌরাণিক মূলক সংখ্যা’কে চল্লিশপতি বলা হয়। ৪০ ‘পৌরাণিক মূলক সংখ্যা’ হলো; ১.এক নিরীক্ষ ২.দুই ফল ৩.তিন তার ৪.চার-চন্দ্র ৫.পঞ্চবাণ ৬.ছয় রিপু ৭.সাত কর্ম ৮.অষ্টাঙ্গ ৯.নয় দ্বার ১০.দশ ইন্দ্রিয় ১১.এগারো রুদ্র ১২.বারো নেতা ১৩.তের নদী ১৪.চৌদ্দ পোয়া ১৫.পনের চল ১৬.ষোল কলা ১৭.আঠারো ধাম ১৮.ঊনিশ রক্ষী ১৯.বিশ আঙুল ২০.একুশ দিন ২১.তেইশ জোড়া ২২.চব্বিশ পক্ষ ২৩.পঁচিশ গুণ ২৪.সাতাশ নক্ষত্র ২৫.ত্রিশ বছর ২৬.বত্রিশ দাঁত ২৭.ছত্রিশ রবি ২৮.বাহান্ন হাট ২৯.চুয়ান্ন মাথা ৩০.বাহাত্তর কম্প ৩১.আশি কর ৩২.চুরাশি ফের ৩৩.দুইশত ছয় হাড় ৩৪.তিনশত দশ গর্ভবাস ৩৫.তিনশত ষাট মূর্তি ৩৬.পাঁচশত শ্বাস ৩৭.ছয়শত ছিষট্টি সূপারি ৩৮.হাজার মাস ৩৯.ছয় হাজার ছয়শত ছিষট্টি সূপারিচ ও ৪০.কোটি ঊর্ণ।

৩ ভাতারখাকী কে? (Who is the Hubby-eateress?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
যতবার বিবাহ করে ততবারই স্বামী মারা যায় এমন হতভাগিনীকে ভাতারখাকী বলা হয়। যখনই রতী দ্বারা দেহ সদৃশ কন্যা সৃষ্টি হয় তখনই আত্মা সদৃশ স্বামী দেহের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। শ্বরবিজ্ঞানে দেহে আত্মা বন্দী হওয়াকে পতিহত্যা বলা হয়। এ সূত্র অনুযায়ী রতী অসংখ্য আত্মা বন্দী করে বলে রতীকে ভাতারখাকী বলা হয়। 

৪ ভাতারখাকীর সঙ্গে বিয়ে হওয়া কী? 
(What is the marriage with the Hubby-eateress?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
শ্বরবিজ্ঞানে দেহকোষ সৃষ্টির আদি-উপাদান রতীকে ভাতারখাকী এবং দেহকোষে আত্মা সঞ্চারিত হওয়াকে বিয়ে হওয়া বলা হয়। যখনই শুক্র দ্বারা দেহকোষ সৃষ্টি হয় তখনই উক্ত দেহকোষে মাতৃকোষ হতে বিদ্যুৎ সদৃশ আত্মা সঞ্চারিত হয়। মাতৃকোষ হতে নতুন দেহকোষে বিদ্যুৎ সঞ্চারিত হওয়াকে সাম্প্রদায়িকরা আত্মা সঞ্চারিত হওয়া বলে থাকেন। মাতৃকোষ হতে দেহকোষে আত্মা সঞ্চারিত হওয়াকেই শ্বরবিজ্ঞানে ভাতারখাকীর সাথে বিয়ে হওয়া বলা হয়। 

৫ স্বর্গীয়া সতী-কন্যা কে? 
(Who is the celestial chastely daughter?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
শ্বরবিজ্ঞানে দেহধাম ও বৈকুণ্ঠকে স্বর্গধাম এবং রতীকে স্বর্গীয়া সতী-কন্যা বলা হয়। এখানে; নরদেহকে স্বর্গধাম বলা হয়েছে। এজন্য; স্বর্গীয়া সতীকন্যা হলো নরদেহের রতী। 

৬ সতী-কন্যা নতুন নতুন পতি ধরে কিভাবে? 
(The chastely-daughter how to taking the new spouse?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
শুক্র দ্বারা সৃষ্টি জীবের আকারকে শ্বরবিজ্ঞানে দেহ বলা হয়। রতীকে স্বর্গীয়া-কন্যা বলা হয়। এজন্য; দেহকেও স্বর্গীয়া কন্যাই বলা হয়। এ সূত্রানুযায়ী দেহ সদৃশ স্বর্গীয়া সতী-কন্যা নতুন নতুন আত্মা গ্রহণ করে বলে স্বর্গীয়া সতী-কন্যার নতুন নতুন পতি গ্রহণ করা বলা হয়। উল্লেখ্য, একই দেহ নতুন নতুন আত্মা গ্রহণ করে না বরং ভিন্ন ভিন্ন দেহ নতুন নতুন আত্মা গ্রহণ করে থাকে। 

৭ শ্বাশুড়ী কে? (Who is mother-in law?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
শ্বরবিজ্ঞানে বিম্বল ও রতী উভয়কেই শ্বাশুড়ী বলা হয়। তবে; এখানে; কেবল বিম্বলকে শ্বাশুড়ী বলা হয়েছে। যেমন; শ্বাশুড়ী বউয়ের সর্ব কাজে নাক-গলাতে থাকে; তেমনই; মৈথুনের সর্বত্রই বিম্বল বিড়ম্বনা সৃষ্টি করতে থাকে। তাই; শ্বরবিজ্ঞানে বিম্বলকে শ্বাশুড়ীর সাথে তুলনা করা হয়। 

৮ ষষ্ঠ-সখী কে কে? (Who is the sixth-confidante?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
শ্বরবিজ্ঞানে ষড়রিপুকে কামের ষষ্ঠসখী বলা হয়। ষড়রিপু হলো; ১. কাম ২. ক্রোধ ৩. লোভ ৪. মোহ ৫. মদ ও ৬. মাৎসর্য। 

৯ দেবপুরী কী? (What is the sanctum?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
শ্বরবিজ্ঞানে দেহকে দেবপুরী বলা হয়। এ সূত্রানুযায়ী শ্বরবিজ্ঞানের ‘বাঙালি পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী’তে বর্ণিত ‘বাঙালি পৌরাণিক মূলক সত্তা’র রূপক নামে ঈশ্বরায়িত, দেবতায়িত ও মানবায়িত পৌরাণিক চরিত্রকে দেব ও দেবতা ইত্যাদি বলা হয়। যেমন; শিশ্ন হতে ‘মদন’। 

১০ দেবপুরী কুলবালা কে? 
(Who is the virgin of the sanctum?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
শ্বরবিজ্ঞানে দেহকে দেবপুরী এবং নরদেহের রতীকে কুলবালা বলা হয়। উল্লেখ্য, রতীকে সর্বপ্রকার শ্বরবিজ্ঞানেই নারীচরিত্রে ব্যবহার করা হয়।  

১১ পতির মুণ্ডুমালা কী? 
(What is the head-garland of the spouse?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
শ্বরবিজ্ঞানে দেহ ও রতীকে কন্যা এবং আত্মা ও বিম্বলকে পতি বলা হয়। স্বামীর মস্তকহারকে পতির মুণ্ডুমালা বলা হয়। রতী সদৃশ কন্যা বলাই সদৃশ শতশত স্বামীকে শুক্রপাত সদৃশ মৃত্যু প্রদান করে থাকে। এর চি‎হ্ন সদৃশ হিন্দুরা রতী সদৃশ কালীর গলায় বলাই সদৃশ পতির মুণ্ডুমালা পরিধান করিয়ে তার পুজা করে থাকেন। প্রকৃত পক্ষে এ মাল্য দ্বারা রতী কর্তৃক মদনকে হত্যা করাই বুঝায়। 

১২ সতী শতধামে রঙ্গলীলা করে কিভাবে?  
(The chaste how to funniment at the hundreds Asylum?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
শ্বরবিজ্ঞানে রতীকে স্বর্গীয়া সতী, দেহকে ধাম এবং কামযজ্ঞকে রঙ্গলীলা বলা হয়। বিশ্বে যত প্রকার দ্বিপস্থ প্রাণী রয়েছে- সবার কাছেই বীর্য বা শুক্র রয়েছে। সব দেহেই শুক্র ও শিশ্নের কামলীলা সংঘটিত হয়েছে, হচ্ছে এবং চিরকাল হতেই থাকবে। এ সূত্র ধরেই শ্বরবিজ্ঞানে সতীর শতধামে রঙ্গলীলার কথা বলা হয়। এছাড়াও; এ কথা আজ দিবালোকের ন্যায় সত্য যে; দ্বিপস্থ জীবের শুক্র ব্যতীত প্রজনন হতে পারে না। কিন্তু একপস্থ জীবের কোনো কাম নেই। এজন্য; তাদের শুক্রেরও প্রয়োজন হয় না। একই শুক্র- বাঘের নিকট, হাতির নিকট, মাছের নিকট, পক্ষীর নিকট আবার মানুষের নিকট। বিশ্বের সর্বত্রই শুক্রের বর্ণ প্রায় সাদা। তাই; বলা হয় এক সতীই বিশ্বের সর্বধামে লীলা করে চলেছে।

    লেখক গুরুদেব মহাত্মা বলন কাঁইজি। 
🖤🙏-জয়গুরু-জয়বাংলা- জয়জগত জয়বলন🙏🖤

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন