দেহ, আত্মা, মন ও জ্ঞান | বলন কাঁইজি

একবিংশ শতাব্দীর মহাসংস্কারক, গবেষক, লেখক, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানী মহাধীমান বলন কাঁইজি কর্তৃক প্রণীত ||

দেহ, আত্মা, মন ও জ্ঞান | বলন কাঁইজি
মহাধীমান বলন কাঁইজি


ভূমিকা

মানুষের জ্ঞানোদয়ের পর হতে দেহ ও আত্মা সম্পর্কে জানার এবং বোঝার জন্য মানুষ আদিকাল থেকেই গবেষণা করে আসছে। আদিকালের গবেষণার বিষয় ছিল—দেহ কী, দেহ কী দ্বারা নির্মিত, আত্মা কী, আত্মা কীভাবে দেহের মধ্যে বিরাজ করে এবং আত্মার পরিচয় কীভাবে লাভ করা যায় ইত্যাদি।

একবিংশ শতাব্দীর মহাসংস্কারক, গবেষক, লেখক, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানী মহাধীমান বলন কাঁইজি কর্তৃক প্রণীত আত্মতত্ত্বভেদ (দ্বিতীয় খণ্ড) গ্রন্থে মরমিবাদ, সুফিবাদ, আধ্যাত্মবাদ, আত্মদর্শন, আধ্যাত্মিকতা, আত্মতত্ত্ব ও দেহতত্ত্ব প্রভৃতির মৌলিক সদস্য চারটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—

  1. দেহ

  2. আত্মা

  3. মন

  4. জ্ঞান


১. দেহ

দেহ বলতে আমরা মানবদেহকেই বুঝি। মানবদেহ অত্যন্ত জটিল ও আশ্চর্যজনক একটি ব্যবস্থা। মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার মাধ্যমে দেহের উৎপত্তি হয়।

বুঝার জন্য উদাহরণস্বরূপ বলা যায়—

  • একটি মৃতদেহের মধ্যে আত্মা, মন ও জ্ঞান নেই।

  • একজন ঘুমন্ত মানুষের মধ্যে দেহ ও আত্মা আছে।

  • একটি শিশুর মধ্যে দেহ, আত্মা ও মন আছে কিন্তু জ্ঞান নেই।

  • একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে দেহ, আত্মা, মন ও জ্ঞান আছে।

তাই বলা যায়, আত্মা ব্যতীত দেহ মৃত লাশের সমতুল্য। দেহ, আত্মা ও মন মিলে শিশু এবং দেহ, আত্মা, মন ও জ্ঞান মিলে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ।

দেহ দুই প্রকার

  1. নর দেহ

  2. নারী দেহ


২. আত্মা

গুরুজি বলন কাঁইজি আত্মার সংজ্ঞা দিয়েছেন—

১. জীবদেহকে সচল রাখার সূক্ষ্ম অলৌকিক শক্তিকে আত্মা বলে।
২. জীবের জীবনী শক্তিকে আত্মা বলে।

আত্মার আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা

শ্বরবিজ্ঞানে জীবদেহের বিদ্যুৎ শক্তিকে আত্মা বলা হয়।

আত্মার প্রকারভেদ

শ্বরবিজ্ঞানে আত্মা পাঁচ প্রকার—

  1. ভূতাত্মা (পঞ্চভূত)

  2. মানবাত্মা (মন)

  3. মহাত্মা (জ্ঞান)

  4. জীবাত্মা (সাঁই)

  5. পরমাত্মা (কাঁই)

এছাড়াও আত্মার বিভিন্ন বিভাগ দেখা যায়।

হিন্দুয়ানি সংস্কৃত মতে

  1. ক্ষিতি

  2. অপ

  3. তেজ

  4. মরুৎ

  5. ব্যোম

হিন্দুয়ানি মতে

  1. পরমাত্মা

  2. ভূতাত্মা

  3. জীবাত্মা

  4. আত্মারাম

  5. আত্মারামেশ্বর

ইসলামি মতে

  1. রূহুল্লাহ

  2. রূহুল আমিন

  3. রূহুল কুদ্দুস

  4. রূহে জিসমানি

  5. রূহে সুলতানি

বাঙালি মতে

  1. পরমাত্মা

  2. ভূতাত্মা

  3. জীবাত্মা

  4. প্রেতাত্মা

  5. গোআত্মা

শ্বরবিজ্ঞানীয় মতে

  1. আগুন

  2. জল

  3. মাটি

  4. বাতাস

  5. বিদ্যুৎ


৩. মন

মনকে মানবাত্মা বলা হয়। মানবীয় কার্যক্রম পরিচালনাকারী আত্মাকে মানবাত্মা বলা হয়।

গুরুজি কাঁইজি মনের সংজ্ঞা দিয়েছেন—

১. জ্ঞানেন্দ্রিয়ের দ্বারা সংকেতের সাহায্যে জীবদেহ পরিচালনাকারী শক্তিকে মন বলে।
২. মানবীয় আচার-ব্যবহারের ধারক বাহক শক্তিকে মন বলে।
৩. মানুষের যাবতীয় সত্ত্বাকে মন বলে।

মনের কিছু বৈশিষ্ট্য

  • মন বিশ্বের সকল ভালো-মন্দ কাজের জন্য দায়ী।

  • মনের অস্তিত্ব সকল জীবের মধ্যে থাকলেও মানুষের মধ্যে অধিক লক্ষ্য করা যায়।

  • মনের সৃষ্টি-ধ্বংস নেই, তবে হ্রাস-বৃদ্ধি ও সক্রিয়তা-নিষ্ক্রিয়তা আছে।

  • মনের অনেক প্রকার সাধন রয়েছে।

  • মনের সক্রিয়তা ও নিষ্ক্রিয়তার পেছনে পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় সমানভাবে দায়ী।

  • মন প্রাকৃতিক শক্তি।

  • মন সর্বজীবে সৃষ্টিগতভাবে বিরাজিত।

  • মন হরণ ও অপহরণযোগ্য শক্তি।

  • মন বিচার ও মীমাংসা করতে অক্ষম।

  • শ্বরবিজ্ঞানে মনকে শিষ্য বলা হয়।

মনের চার প্রকার

  1. অচেতন মন

  2. অবচেতন মন

  3. চেতন মন

  4. সচেতন মন

মনের মন্দপক্ষ

রিপু (৬)

  1. কাম

  2. ক্রোধ

  3. লোভ

  4. মোহ

  5. মদ

  6. মাৎসর্য

রুদ্র (১১)

  1. অজ্ঞানতা

  2. অন্ধত্ব

  3. অন্যায়

  4. উগ্রতা

  5. তাণ্ডব

  6. হতাশা

  7. ব্যর্থতা

  8. ঘৃণা

  9. বৈরাগ্য

  10. অসন্তোষ

  11. হত্যা

মন্দা (১০)

  1. অহংকার

  2. হিংসা

  3. শত্রুতা

  4. রাগ

  5. কুট্সা

  6. লিপ্সা

  7. মিথ্যা

  8. কৃপণতা

  9. কলহ

  10. আমিত্ব

দশা (১০)

  1. উদ্বেগ

  2. জাগরণ

  3. কুঁড়েমি

  4. মলিনতা

  5. প্রলাপ

  6. ব্যাধি

  7. উন্মাদ

  8. অশান্তি

  9. ভুল

  10. জরা

সর্বমোট মনের মন্দপক্ষের বাহিনীর সংখ্যা ৩৭।

মনের ভালোপক্ষের সত্ত্বা (১০)

  1. প্রতিজ্ঞা

  2. ধৈর্য

  3. প্রশংসা

  4. সাহস

  5. নিষ্ঠা

  6. ভয়

  7. তৃপ্তি

  8. প্রেম

  9. অভিনিবেশ

  10. গণনা


৪. মহাত্মা (জ্ঞান)

আদিকাল থেকেই মানুষ আত্মা বিষয়ক জ্ঞান লাভ করে আসছে।

জ্ঞানের সংজ্ঞা

১. ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য যেসব তথ্য চিত্তপটে সঞ্চিত থাকে তাকে জ্ঞান বলে।
২. কোনো বিষয় বা বস্তুর বাস্তবতা জানার জন্য তার প্রকৃত বিচার-বিশ্লেষণ চিত্তপটে সঞ্চিত হওয়াকে জ্ঞান বলে।
৩. মানুষের ভালো-মন্দ কর্মের বিচার বিশ্লেষণ শক্তিকে জ্ঞান বলে।
৪. জ্ঞানেন্দ্রিয়ের আহরিত ইঙ্গিত দ্বারা কোনো বিষয়বস্তুর বাস্তবতা জানার শক্তিকে জ্ঞান বলে।

জ্ঞানের বৈশিষ্ট্য

  1. জ্ঞান সৃষ্টি করা যায়।

  2. জ্ঞানকে নিষ্ক্রিয় করা যায়।

  3. জ্ঞানের হ্রাস করা যায়।

  4. জ্ঞানের বৃদ্ধি করা যায়।

  5. মানুষের জীবনের ভুল সিদ্ধান্তের জন্য জ্ঞান দায়ী।

  6. জ্ঞান মনকে দিক নির্দেশনা দেয়।

  7. জ্ঞান অর্জিত সম্পদ।

  8. জ্ঞান আহরণের দ্বারা সক্রিয় হয়।

  9. জ্ঞান দ্বারা কাজের প্রায় অর্ধেক সফলতা অর্জন করা যায়।

  10. জ্ঞান কৃত্রিম শক্তি।

  11. জ্ঞানের সৃষ্টি ও ধ্বংস রয়েছে।

  12. জ্ঞান শুধু জীবদেহে সীমাবদ্ধ।

জ্ঞান সাধনের প্রকার

  1. অক্ষরজ্ঞান সাধন

  2. প্রকৌশল জ্ঞান সাধন

  3. সাধারণ জ্ঞান সাধন

  4. বাস্তব জ্ঞান সাধন

  5. রূপক জ্ঞান সাধন

জ্ঞানেন্দ্রিয়

  1. চক্ষু

  2. কর্ণ

  3. নাসিকা

  4. জিহ্বা

  5. ত্বক

জ্ঞানের মূল দুই প্রকার

  1. দিব্যজ্ঞান

  2. বস্তুজ্ঞান

শ্বরবিজ্ঞানে জ্ঞান চার প্রকার

  1. প্রকাশ্য (দালালাত)

  2. ইঙ্গিত (ইশারাত)

  3. ব্যাখ্যা (তাফসির)

  4. মর্মার্থ বা ভাবার্থ (তাবিল)

ইসলামি মতে জ্ঞান চার প্রকার

  1. ব্যাখ্যা (শরিয়ত)

  2. পরস্পরা (তারিকত)

  3. পরিচয় (মারিফত)

  4. বাস্তবতা (হাকিকত)

উৎপত্তিমূল ভেদে জ্ঞান

  1. প্রাকৃতিক জ্ঞান

  2. কৃত্রিম জ্ঞান

শ্বরবিজ্ঞানে উৎপত্তিমূল ভেদে

  1. প্রাকৃতিক জ্ঞান

  2. বৈষয়িক জ্ঞান

  3. পারস্পরিক জ্ঞান


উপসংহার

সংক্ষেপে দেহ, আত্মা, মন ও জ্ঞান নিয়ে আলোচনার এই ক্ষুদ্র প্রয়াসে ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। ধৈর্যসহকারে আলোচনা পাঠের জন্য সকল পাঠককে আন্তরিক ধন্যবাদ।

মহাধীমান গুরুজি বলন কাঁইজির অভয় চরণে শ্রদ্ধা-ভক্তি জ্ঞাপন করে আজকের মতো বিদায় নিচ্ছি।

জয় গুরু।

গ্রন্থ - আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানী মহাধীমান বলন কাঁইজি কর্তৃক প্রণীত আত্মতত্ত্বভেদ (দ্বিতীয় খণ্ড)

✍️ মানোবান কলিমুল্লাহ হক

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন